বয়সঃ৪৩
জন্ম তারিখঃ০১/০১/১৯৮১
জন্মস্থানঃদক্ষিণখান, উত্তরা, ঢাকা
যেভাবে শহীদ হয়েছেনঃতিনি উত্তরা আজমপুরে পুলিশের গুলিতে গুলিবিদ্ধ হন।
খোঁজ নিয়ে ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, উত্তরার যে কোন আন্দোলন সংগ্রামকে সাবেক এমপি হাবিব হাসান এবং তার পুরো পরিবার নির্মমভাবে দমন করতো। তার ব্যতিক্রম হয়নি এবারের বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনেও। হাবিব হাসানের ছেলে আবির হাসান তামিম এবং তার আপন ছোট ভাই আলাউদ্দিন সোহেল দলবল নিয়ে সাবেক এমপির নেতৃত্বে পুরো আন্দোলনের সময় বারবার অস্ত্র হাতে সরাসরি আক্রমণ চালিয়েছে। এ সংক্রান্ত বেশ কিছু ফুটেজ সাংবাদিকদের কাছে সংরক্ষিত আছে।
এ প্রসঙ্গে শহিদের মৃত্যুর সময় পাশে থাকা বস্ত্র প্রকৌশলী তালহা যুবায়ের সজিব (৩৫) বলেন, ‘১৯ জুলাই আমরা দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মিছিল-মিটিং নিয়ে উত্তরার রাজপথ দখলে রেখেছিলাম। সন্ধ্যার আগ দিয়ে পুলিশ ও সরকার দলীয় ক্যাডারদের ধাওয়া খেয়ে ৬ নম্বর সেক্টর বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালের সামনে দিয়ে পূর্ব দিকে যাচ্ছিলাম। ওই দলে আমরা লোক ছিলাম ১০-১৫ জন। আমার পাশে ছিল শহিদ জোবায়ের। হঠাৎ করে কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই পেছন থেকে একটি গুলি তার পিঠ ভেদ করে সামনে দিয়ে বেরিয়ে যায়। সাথে সাথে সে উপুড় হয়ে পড়ে যায়। আমরা দেখি জায়গাটা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। পশ্চিম দিক হতে পুলিশ এবং লীগের ছোঁড়া গুলিতে সে শহিদ হয়। পুলিশের অস্ত্র নিয়ে লীগের ছেলেরা গুলি করছিল। গুলিটা শুধু ওকে টার্গেট করে করা হয়েছে।’
ঐদিন ঘটনাস্থলে এ প্রতিবেদকসহ বেশ কয়েকজন সাংবাদিক সংবাদ সংগ্রহের কাজে ছিলাম। আমরা পরবর্তীতে হাসপাতালে গিয়ে তার গায়ে বিদ্ধ বুলেটের ছবি তুলি। চাইনিজ রাইফেলের বড় গুলি। সেই বুলেটের ছবি এখনো বাসস’র কাছে সংরক্ষিত আছে। ওই গুলিতে জোবায়ের সাথে সাথে মারা যায়।
জীবনীঃঢাকা, ২২ ডিসেম্বর, ২০২৪ (বাসস): শহিদ হওয়ার দিনও জোবায়ের বেপারী তাঁর স্ত্রীকে বলেছিলেন, ‘দেখো, আজকেই হাসিনার শেষ দিন।’
তিনি সবসময়ই তাঁর স্ত্রীকে বলতেন, ‘স্বৈরাচার সরকার আমরা নামাবোই, নামায়াই ছাড়বো।’
ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতন হয়েছে ঠিকই। কিন্তু তা এক সাগর রক্তের বিনিময়ে। সেটাও দেখে যেতে পারেননি শহিদ জোবায়ের। তার আগে ১৯ জুলাই সন্ধ্যার ঠিক আগে গুলিতে প্রাণ হারান তিনি।
এদিকে ঠিক আগের দিন ১৮ই জুলাই উত্তরার বুকে যেন নেমে এসেছিল রোজ কিয়ামত। রাজধানী ঢাকার উত্তর প্রবেশ পথ উত্তরা। এ জনপদের মানুষ একদিনে এতো লাশ এর আগে দেখেনি কোনদিন।
মৃত্যুর এত বিভীষিকা দেখেও রাজপথের সংগ্রামীরা পিছু হটেননি। একটুও বিচলিত হননি। তারা আবার পরদিন শুক্রবার বারোটার দিকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক দখলে নেয়। আর এ আন্দোলনে একেবারে সামনের সারির নেতৃত্বে ছিলেন শহিদ মো. জোবায়ের বেপারী (৪২)।
মাত্র ২৩ বছর বয়সে বিধবা হওয়া শহীদের স্ত্রী চাঁদ মনি বলেন, ‘তিনি আজীবন প্রতিবাদী ছিলেন। আন্দোলন-সংগ্রামের ডাক আসলে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়তেন। তারই ধারাবাহিকতায় এবারের বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনেও পহেলা জুলাই থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত উত্তরায় এবং ঢাকার রাজপথে সমানভাবে সক্রিয় ছিলেন। প্রতিদিন মিছিল মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করতেন এবং বাসায় এসে খুব উত্তেজিত হয়ে তার বর্ণনা দিতেন।’
...
এ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসস’র প্রতিনিধির কাছে তাঁর বাবা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমাকে এখন ডাক্তারের কাছে কে নিয়ে যাবে? আমার হাতের ন্যাওটা [সার্বক্ষণিক সঙ্গী] ছিল আমার এই সন্তানটা। সাবেক এমপি কুখ্যাত হাবিব হাসান ও খসরু চৌধুরীর লোকেরা আমার ছেলেটাকে টার্গেট করে মেরেছে। আমার জমি-জমা নিয়ে হাবিব হাসানের লোকজন খুব জ্বালাতন করতো। এসব ব্যাপারে সবসময় ছেলেটা প্রতিবাদ করতো। এই প্রতিবাদটাই ওর জন্য কাল হলো। ও বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল। সেচ্ছাসেবক দল করতো।’
জোবায়েরের সাত বছরের সংসারে দু’টি ফুটফুটে বাচ্চা রয়েছে। মৃত্যুর কিছুদিন পরই তাদের সপ্তম বিবাহ বার্ষিকী ছিল। বড় ছেলে জায়ান (৬) প্লে গ্রুপে এবং ছোট ছেলে রাইয়ান (৪) নার্সারিতে পড়ে। পিঠাপিঠি দুই ভাই ওরা এখনো বোঝে না ওদের বাবা আর নেই।
সরকারি বা বেসরকারি কোন সহযোগিতা পেয়েছেন কিনা? জানতে চাইলে শহিদের স্ত্রী বলেন, ‘আমরা সরকারি কোন রকম সহযোগিতা এখন পর্যন্ত পাইনি। জামায়াতে ইসলামীর কাছ থেকে ২ লক্ষ টাকা এবং বিএনপি’র কাছ থেকে ১ লাখ টাকা পেয়েছি।’